স্বামী বিবেকানন্দের চিরন্তন বাণীর সংকলন
আধ্যাত্মিকতা ও কর্ম
ভগবান কৃষ্ণাবতারে বলিতেছেন যে, সব প্রকার দুঃখের কারণ 'অবিদ্যা' নিষ্কাম কর্ম দ্বারা চিত্ত শুদ্ধি হয়।
শরীর তো যাবেই, কুড়েমিতে কেন যায়? It is better to wear out than to rust out (মরচে পড়ে পড়ে মরার চেয়ে ক্ষয়ে মরা ভাল) মরে গেলেও হাড়ে হাড়ে ভেলকি খেলবে তার ভাবনা কি?
প্রেমের শক্তি
ভালবাসা কখন বিফল হয় না। আজই হউক, কালই হউক, শত শত যুগ পরেই হউক প্রেমের জয় হইবেই। তোমরা কি মনুষ্যজাতিকে ভালবাস? ঈশ্বরের অন্বেষণে কোথায় যাইতেছ? দরিদ্র, দুঃখী দুর্বল সকলেই কি তোমার ঈশ্বর নহে? অগ্রে তাহাদের উপাসনা কর না কেন?
চরিত্র গঠন ও মানবসেবা
হামবড়া বা দলাদলি বা ঈর্ষা একেবারে জন্মের মত বিদায় করিতে হইবে। পৃথিবীর ন্যায় সর্বংসহ হইতে হইবে। এইটি যদি পার দুনিয়া তোমাদের পায়ের তলায় আসবে।
ব্রহ্মদর্শন
শুধু ব্রহ্মই আছেন। জন্ম নাই মৃত্যু নাই, দুঃখ নাই, কষ্ট নাই, নর হত্যা নাই, কোন রূপ পরিণাম নাই, ভালও নাই, মন্দও নাই- সর্বই ব্রহ্ম। আমরা রজ্জুতে সর্পভ্রম করছি- 'ভ্রম আমাদেরই।
নির্বিঘ্নে উদ্দেশ্যসিদ্ধি করতে হলে হঠাৎ তাড়াতাড়ি কিছু করে ফেলা উচিৎ নয়। পবিত্রতা, সহিষ্ণুতা ও অধ্যাবসায় এই তিনটি গুণ, আবার সর্বোপরি প্রেম সিদ্ধি লাভের জন্য একান্ত আবশ্যক।
যুবশক্তির আহ্বান
মানুষ চাই, মানুষ চাই, আর সব হইয়া যাইবে বীর্যবান, সম্পূর্ণ অকপট তেজস্বী বিশ্বাসী যুবক আবশ্যক। এইরূপ এক শত যুবক হইলে সমগ্র জগতের ভাব স্রোত ফিরাইয়া দেওয়া যায়।
ভাবিও না তোমরা দরিদ্র। ভাবিও না তোমরা বন্ধুহীন, কে কোথায় দেখিয়েছে, টাকায় মানুষ করে? মানুষ চিরকাল টাকা করিয়া থাকে। জগতের যা কিছু উন্নতি সব মানুষ শক্তিতে হইয়াছে, উৎসাহের শক্তিতে হইয়াছে, বিশ্বাসের শক্তিতে হইয়াছে।
মননশক্তির গুরুত্ব
তুমি যাহা চিন্তা করিবে, তাহাই হইয়া যাইবে। যদি তুমি নিজেকে দুর্বল ভাব, তবে দুর্বল হইবে। তেজস্বী ভাবিলে তেজস্বী হইবে।
যে যা বলে বলুক, আপনার গোঁয়ে চলে যাও- দুনিয়া তোমার পায়ের তলায় আসবে, ভাবনা নেই। বলে- একে বিশ্বাস কর, ওকে বিশ্বাস কর; বলি, প্রথমে আপনাকে বিশ্বাস কর দিকি। নিজের উপর বিশ্বাস রাখ সমুদয় শক্তি তোমার ভিতরে- এইটি জান এবং ঐ শক্তি অভিব্যক্তি কর।
বীরত্ব ও সাহস
হে বীরহৃদয় যুবকগণ, তোমরা বিশ্বাস করো যে, তোমরা বড় বড় কাজ করবার জন্য জন্মেছ। কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাকে ভয় পেও না- এমনকি আকাশ থেকে প্রবল বজ্রাঘাত হলেও ভয় পেও না খাড়া হয়ে ওঠো; ওঠো, কাজ কর।
অপরের জন্য ক্ষুদ্রতম কাজ করিলে নিজের 'ভিতরের শক্তি জাগ্রত হয়। এমনকী অপরের সামান্য কল্যাণ চিন্তা ক্রমশ মনের মধ্যে সিংহের শক্তি সঞ্চারিত করে।
মুষ্টিমেয় মানুষ পৃথিবীকে তাহার কক্ষপথ হইতে ছিটকাইয়া দিতে পারে, যদি তাহার চিন্তা, বাক ও কর্মে সংযুক্ত হয়। এই প্রত্যয় কখনও ভুলিও না।
দুর্বলতা ও শিক্ষা
জানিও সকল পাপ ও সকল অশুভ- এক 'দুর্বলতা' শব্দ দ্বারাই নির্দিষ্ট হইতে পারে। সকল অসৎ কার্যের মূল দুর্বলতা। যাহা করা উচিত নয়, দুর্বলতার জন্যই মানুষ তাহা করিয়া থাকে, দুর্বলতার জন্যই মানুষ তাহার প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ করিতে পারে না।
শিক্ষার প্রকৃত রূপ
দেশে কি মানুষ আছে? ও শ্মশানপুরী। যদি Lower class দের education (নিম্নশ্রেণীদের শিক্ষা) দিতে পার, তাহলে উপায় হতে পারে, জ্ঞানবলের চেয়ে বল আর কি আছে- বিদ্যা শেখাতে পার?
যাতে চরিত্র তৈরি হয়, মনের শক্তি বাড়ে বুদ্ধির বিকাশ হয়, নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে পারে, এই রকম শিক্ষা চাই।
শিক্ষকের কার্য কেবল পথ থেকে সব অন্তরায় সরিয়ে দেওয়া। আমি যেমন সর্বদা বলে থাকি, 'অপরের অধিকারে হাত দিও না, তা হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।' অর্থাৎ আমাদের কর্তব্য, রাস্তা সাফ করে দেওয়া।
ভারতের আধ্যাত্মিক দান
আধ্যাত্মিক আলোকই পৃথিবীর কাছে ভারতের দান।... শান্ত শিশির-সম্পাতের মতো এই ধীর সহিষ্ণু 'সর্বংসহ' ধর্মপ্রবণ জাতি চিন্তাজগতে নিজ প্রভাব বিস্তার করছে।
শারীরিক শক্তি বলে অনেক অদ্ভুত কার্য সম্পন্ন হইতে পারে সত্য; বুদ্ধি বলে বিজ্ঞানে যন্ত্রাদি নির্মাণ করিয়া তাহা-দ্বারা অনেক অদ্ভুত কার্য দেখানো যায়, ইহাও সত্য, কিন্তু আধ্যাত্মিক শক্তির যেরূপ প্রভাব, এগুলির প্রভাব তাহার তুলনায় কিছুই নহে।
যে যত বড় হয়েছে, তার উপরে তত কঠিন পরীক্ষা হয়েছে। এই পৃথিবী একটি বিরাট ব্যায়ামাগার, এখানে আমরা আসি নিজেদের সবল করিয়া তুলিতে।
খেতে শুতে পরতে, গাইতে বাজাতে, ভোগে রোগে কেবলই সৎ সাহসের পরিচয় দিবি। তবে তো মহাশক্তির কৃপা হবে।
চরিত্রবান যুবকের ভূমিকা
তোমরা যদি আমার সন্তান হও, তবে তোমরা কিছুই ভয় করবে না, কিছুতেই তোমাদের গতি রোধ করতে পারবে না। তোমরা সিংহতুল্য হবে।... প্রতি পদক্ষেপেই আমার শুভ ইচ্ছা এবং আশীর্বাদ তোমাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকবে... যদি তোমার বিশ্বাস থাকে, তবে তোমার সব শক্তি আসবে।
দান ও সেবা
জগতে সর্বদাই দাতার আসন গ্রহণ করো।... সাহায্য দাও সেবা দাও যতটুকু যা তোমার দেবার আছে দিয়ে যাও; কিন্তু সাবধান, বিনিময়ে কিছু চেও না।
চরিত্রবান, বুদ্ধিমান পরার্থে সর্বত্যাগী এবং আজ্ঞানুবর্তী যুবকগণের উপরেই আমার ভবিষ্যৎ ভরসা- আমার idea (ভাব) গুলি যারা work out (কাজে পরিণত) করে নিজেদের ও দেশের কল্যাণ-সাধনে জীবনপাত করতে পারবে।
প্রথম প্রথম সফল না হও, ক্ষতি নাই এই বিফলতা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ইহা মানবজীবনের সৌন্দর্য। এরূপ বিফলতা না থাকিলে জীবনটা কি হইত? যদি জীবনে এই বিফলতাকে জয় করিবার চেষ্টা না থাকিত, তবে জীবন ধারণ করিবার কোনও মূল্য থাকিত না। উহা না থাকিলে জীবনে কবিত্ব কোথায় থাকিত?
জাগরণ ও নেতৃত্ব
'আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায়চ' আমাদের জন্ম; কি করছিস্ সব বসে বসে? ওঠ-জাগ, নিজে জেগে অপর সকলকে জাগ্রত কর্, নরজন্ম সার্থক করে চলে যা। 'উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্ নিবোধত।'
নেতৃত্বের গুণাবলী
নেতা কি বানাতে পারা যায়? Leader (নেতা) জন্মায়। লিডারি করা আবার বড় শক্ত- দাসস্য দাসঃ, হাজারো লোকের মন যোগানো। ঈর্ষা, স্বার্থপরতা আদপে থাকবে না- তবে Leader (নেতা) প্রথম by birth (জন্মগত), দ্বিতীয় unselfish (নিঃস্বার্থ), তবে Leader (নেতা)।... 'প্রীতিঃ পরমসাধনম্'।
সকলের সঙ্গে মিশতে হবে, কাউকে চটাতে হবে না। (All the powers of good against all the powers of evil) সমুদয় অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সমুদয় শুভ শক্তি প্রয়োগ করতে হবে- এই হচ্ছে কথা।
জগতের ইতিহাস হইল- পবিত্র, গম্ভীর, চরিত্রবান এবং শ্রদ্ধাসম্পন্ন কয়েকটি মানুষের ইতিহাস। আমাদের তিনটি বস্তুর প্রয়োজন- অনুভব করিবার হৃদয়, ধারণা করিবার মস্তিষ্ক এবং কাজ করিবার হাত।... যদি তুমি পবিত্র হও, যদি তুমি বলবান হও, তাহা হইলে তুমি একাই সমগ্র জগতের সমকক্ষ হইতে পারিবে।
অন্তিম আহ্বান
চালাকি দ্বারা কোনও মহৎ কার্য হয় না। প্রেম সত্যানুরাগ ও মহাবীর্যের সহায়তায় সকল কার্য সম্পন্ন হয়। তৎকুরু পৌরুষম্ (সুতরাং পৌরুষ প্রকাশ করো)।
.... আমার আশা আর ভরসা তোমাদের মতো লোকের উপর। আমার কথাগুলির প্রকৃত তাৎপর্য বুঝে, তারই আলোতে কাজ করবার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করো। ...আমি তোমাদের যথেষ্ট উপদেশ দিয়েছি এবার কিছুটা অন্তত কার্যকরী করো। জগৎ দেখুক যে আমার বাণী শোনা তোমাদের সফল হয়েছে।
স্বামী বিবেকানন্দের এই বাণীগুলো শুধু পড়ার জন্য নয়, জীবনে প্রয়োগ করার জন্য। প্রতিটি বাণী আমাদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা ও শক্তি সঞ্চার করতে পারে। তাঁর শিক্ষা আজও সমভাবে প্রাসঙ্গিক এবং যুবসমাজের জন্য পথনির্দেশক। এই বাণীগুলো নিয়মিত চর্চা ও অনুশীলন করে আমরা আমাদের ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারি।

Post a Comment